ঢাকা , শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ , ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চাঁপাইনবাবগঞ্জে গোসলে নেমে একসঙ্গে ৫ শিশুর মৃত্যু নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ফের বন্যার আশঙ্কা : উদ্ধারকাজ স্থগিত করল চীন এডমিরাল পদে পদোন্নতি পেলেন নৌবাহিনী প্রধান খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কী করতে পারেন, কী পারেন না? শপথ নিতে যাওয়া ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী কে কোন মন্ত্রণালয়ে কারা মহাপরিদর্শকের বদলি নিয়ে অপপ্রচার, জাতিসংঘ মিশনে নতুন দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কতটুকু, বেতন–ভাতাসহ যেসব সুবিধা পান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি ৬ এমপি সংশোধন হবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি ভোটের মুখোমুখি মির্জা ফখরুল ও অলি আহমেদ ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়েছেন দীপু মনি অবশেষে বিএনপির রাষ্ট্রপতি পদে মনোনোয়ন পেলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০ আগস্ট শিক্ষার্থীদের সাথে উৎসবমুখর পরিবেশে ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলায় বইপড়া কর্মসূচীর শুভসূচনা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাহিত্য আড্ডা রং ফর্সাকারী ৮ ব্র্যান্ডের ক্রিমে বিপজ্জনক মাত্রায় ক্ষতিকর উপাদান থাকায় বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা অত্যাচারের ছবি যেন আর তুলতে না হয়, সেই সমাজ গড়তে হবে: আলাল ‘গুলশানের চামেলি’তে ভিন্ন রূপে এডলফ খান, অভিনয় করবেন যৌনকর্মীর দালাল চরিত্রে

বাউল আব্দুল করিম শাহ্: লালনগীতির আদি সুরের সাধক

  • আপলোড সময় : ১৪-০৭-২০২৬ ০৮:৪৪:২৮ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৪-০৭-২০২৬ ০৮:৪৪:২৮ অপরাহ্ন
বাউল আব্দুল করিম শাহ্: লালনগীতির আদি সুরের সাধক
রিঙকু অনিমিখ

বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে বাউল আব্দুল করিম শাহ্ এমন এক সাধক-শিল্পী, যিনি লালন শাহের গানকে কেবল গানরূপে পরিবেশন করেননি, বরং একে সাধনা, দর্শন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে আজীবন ধারণ করেছেন। তিনি ছিলেন লালন-পরম্পরার একজন বিশুদ্ধ ধারক, যার কণ্ঠে লালনের বহু অপ্রচলিত দুষ্প্রাপ্য গান আদি সুরে সংরক্ষিত হয়েছে। আধুনিক সংগীতায়োজনের ভিড়ে যখন লালনের গানের সুর, গায়কি পরিবেশনভঙ্গি ক্রমে পরিবর্তিত হচ্ছিল, তখন আব্দুল করিম শাহ্ নিষ্ঠার সঙ্গে সেই প্রাচীন ধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করেছেন। কারণে তিনি কেবল একজন গায়ক নন, লালন-ঐতিহ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষক হিসেবেও বিবেচিত।

আব্দুল করিম শাহ্ ১৯২৯ সালের ১০ জুলাই কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার অঞ্জনগাছি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ঝুমুর আলী জোয়ার্দার। তিনিও একজন বাউল শিল্পী ছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়স থেকেই বাবার কাছে তিনি লালনের গাছের চর্চা শুরু করেন। কৈশোরে জারি, সারি, পালাগান এবং বাউলগানের বিভিন্ন আসরে অংশ নিতে নিতে তাঁর সংগীতজীবনের সূচনা ঘটে। ধীরে ধীরে তিনি লালন-ভাবধারার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন এবং ফকিরি সাধনার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। পরবর্তীকালে তিনি লালন-অনুসারী সাধকসমাজের সংস্পর্শে এসে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় প্রচলিত বহু গান সুর আত্মস্থ করেন।

তাঁর শিল্পীজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল লালনের অপ্রচলিত দুষ্প্রাপ্য গান সংগ্রহ এবং সেগুলো আদি সুরে পরিবেশন করা। লালনের বহু গান দীর্ঘদিন মৌখিক পরম্পরায় টিকে ছিল; অনেক গানের লিখিত পাঠ বা নির্ভরযোগ্য সুর সংরক্ষিত ছিল না। আব্দুল করিম শাহ্ প্রবীণ ফকির বাউলসাধকদের কাছ থেকে সেই গানগুলো শিখেছেন এবং বহু বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিবেশন করেছেন। তাঁর গায়কিতে কণ্ঠের চাকচিক্যের চেয়ে ভাব, উচ্চারণ, বাণীর অর্থ এবং আদি সুরের প্রতি বিশ্বস্ততাই ছিল মুখ্য।

তিনি বিশ্বাস করতেন, লালনের গান কেবল গাওয়া যায় না; তা উপলব্ধি করতে হয়। তাই তাঁর পরিবেশনায় কখনো অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র বা আধুনিক সংগীতায়োজনের প্রাধান্য দেখা যায় না। একতারা, ডুগি, খমক কিংবা দোতারার সহজ সঙ্গত এবং গভীর ভাবমগ্ন কণ্ঠে তিনি লালনের দর্শনকে প্রকাশ করতেন। তাঁর মতে, লালনের গানের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে তার দর্শন, মানবতাবাদ এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে; বাহ্যিক সংগীতায়োজনে নয়।

আব্দুল করিম শাহ্ ছিলেন অত্যন্ত নিভৃতচারী মানুষ। লোকজীবনের সহজ-সরল পরিবেশেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। খ্যাতি বা প্রচারের চেয়ে তিনি গুরুত্ব দিতেন সাধনা গানের বিশুদ্ধতাকে। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনস্মরণ উৎসবসহ দেশের নানা বাউল-আসরে তিনি নিয়মিত গান পরিবেশন করতেন। নিজের সাধনার পাশাপাশি কুষ্টিয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি লালন আখড়া একাডেমিতে শিক্ষকতা করে তিনি তৈরি করেছেন একঝাঁক নতুন বাউল শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে লালনের এমন বহু গান সংরক্ষিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অজানা ছিল। কারণে গবেষক, সংগীতশিল্পী লালন-অনুরাগীদের কাছে তিনি ছিলেন এক নির্ভরযোগ্য উৎস।

বাংলাদেশ সরকার লোকসংগীতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে তাঁকে একুশে পদক প্রদান করে। এই রাষ্ট্রীয় সম্মান মূলত তাঁর ব্যক্তিগত শিল্পীসাফল্যের জন্যই নয়, বরং লালনগীতির প্রাচীন ধারা সংরক্ষণে তাঁর দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি।

২০১৪ সালের ১০ জুন তিনি কুষ্টিয়া শহরতলীর চৌড়হাস এলাকায় নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লালন-পরম্পরার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাধক-শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে সংরক্ষিত গান, তাঁর পরিবেশনরীতি এবং তাঁর শিল্পদর্শন আজও লালনচর্চার ক্ষেত্রে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বাংলা লোকসংগীতের ইতিহাসে বাউল আব্দুল করিম শাহ্-এর স্থান এই কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ যে, তিনি লালনের গানকে জনপ্রিয় করার চেয়ে তার বিশুদ্ধতা রক্ষা করাকে অধিক মূল্য দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, একটি লোকগানের প্রাণ তার আদি সুর, ভাব এবং মৌখিক ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত। তাই তাঁর সমগ্র শিল্পীজীবন ছিল এক অর্থে সংরক্ষণের সাধনা। লালন ফকিরের অপ্রচলিত গান, প্রাচীন সুর ফকিরি গায়কির যে ধারা তাঁর কণ্ঠে বেঁচে আছে, তা বাংলা লোকসংস্কৃতির এক অমূল্য ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

লেখক: কবি ও চারুশিল্পী
 

কমেন্ট বক্স
প্রতিবেদকের তথ্য

এবার সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ সেই গাজী নজরুল

এবার সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ সেই গাজী নজরুল